শুক্রবার , ১৪ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ
×

বিদ্রোহ রাশিয়ায় ওয়াগনার বাহিনীর

 রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রবল বিক্রমে ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করেছিলেন। দিশাহীন হয়ে পড়া সে যুদ্ধ পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার দিকে ঠেলে দিয়েছে। সেই যুদ্ধই এখন হাজির হয়েছে পুতিনের ঘরের দুয়ারে। রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে ওয়াগনার বাহিনী। বলা হচ্ছে, যার জের ধরে প্রেসিডেন্ট পুতিনের ক্ষমতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। গত ২৩ বছর ধরে রাশিয়া শাসন করছেন পুতিন। দীর্ঘ এই শাসনামলে প্রথমবার তিনি এতটা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেন। তাও আপন লোকদের দ্বারাই।

ওয়াগনার বাহিনীর প্রধান ইয়েভগেনি প্রিগোজিন, যিনি পুতিনের ঘনিষ্ঠজন বলেই পরিচিত, হঠাৎ করেই তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়ার সামরিক নেতৃত্ব গত শুক্রবার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে তার বাহিনীর বহু সেনাকে হত্যা করেছে, তাই তিনি তাদের নিজ নিজ পদ থেকে অপসারণ করে শাস্তি দিতে চান। এ অভিযোগ জানানোর কয়েক ঘণ্টা পর শনিবার ভোররাতে প্রিগোজিন জানান, তার ওয়াগনার বাহিনীর যোদ্ধারা ইউক্রেন থেকে সীমান্ত অতিক্রম করে রাশিয়ার রস্তোভ অঞ্চলে প্রবেশ করেছে এবং তারা মস্কোর সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যেতে প্রস্তুত।

দিনভর ওয়াগনার বাহিনী রস্তোভ থেকে ১,১০০ কিলোমিটার দূরে মস্কোর পথে অগ্রসর হয়েছে। গতকাল তারা লিপিয়েৎস্ক অঞ্চল অতিক্রম করে। যেখান থেকে মস্কো মাত্র ছয় ঘণ্টার পথ, দূরত্ব ২০০ কিলোমিটারেরও কম। এ অবস্থায় রাশিয়া এক গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে বলে আশংকা যখন বাড়ছিল তখন সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, ওয়াগনার বাহিনী রাশিয়ার রাজধানী অভিমুখে যাত্রা ‘বন্ধ’ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। রক্তপাত এড়াতে সৈন্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথাও বলেছেন ইয়েভগেনি প্রিগোজিন। বেলারুশ প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার লুকাশেঙ্কোর সঙ্গে আলোচনার সময় ওয়াগনার বাহিনী প্রধান তার যোদ্ধাদের আর অগ্রসর হবেন না বলে রাজি হন। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন রুশিয়া ২৪ নিউজ চ্যানেলের উদ্ধৃতি দিয়ে বিবিসি এ ঘটনার লাইভ প্রতিবেদনে জানায়, পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপের দিকে না যায় সেজন্য প্রিগোজিন তা মেনে নিয়েছেন। এই নাটকীয় ঘোষণায় গত দুই দিনের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা অনেকটা স্তিমিত হয়ে যায়।

এর আগে এক ভাষণে পুতিন উদ্ভূত পরিস্থিতিকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ বলে বর্ণনা করেছেন। এ পরিস্থিতিকে তিনি এক শতাব্দী আগে রাশিয়ায় হওয়া গৃহযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে একে কঠোর হাতে দমনের প্রতিজ্ঞা করেন। বলেন, ‘যারা ইচ্ছাকৃতভাবে বিশ্বাসঘাতকতার পথে পা দিয়েছে, যারা সশস্ত্র বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিয়েছে, যারা হুমকি দিয়ে সুবিধা আদায় এবং সন্ত্রাসবাদের পথ বেছে নিয়েছে, তারা অনিবার্য শাস্তি ভোগ করবে। আইন এবং আমাদের জনগণ উভয়ের কাছেই তাদের জবাবদিহি করতে হবে।’

ইউক্রেনের দোনেৎস্ক প্রদেশে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানায়, মস্কো অভিমুখে যাত্রা করা ওয়াগনার দলটিতে প্রায় পাঁচ হাজার যোদ্ধা রয়েছে, যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জ্যেষ্ঠ ওয়াগনার কমান্ডার দিমিত্রি উৎকিন। যদিও ওয়াগনার প্রধান প্রিগোজিন দাবি করেছেন তার সঙ্গে ২৫ হাজার যোদ্ধা রয়েছে।

ওয়াগনার বাহিনী মস্কোর কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় চলমান পরিস্থিতিকে ‘কঠিন’ বলে বর্ণনা করেন মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন। গতকাল তিনি মস্কোকে ‘সন্ত্রাস বিরোধী অভিযান অঞ্চল’ ঘোষণা করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেন। ঝুঁকি কমাতে তিনি আগামীকাল সোমবার মস্কোয় ‘নন–ওয়ার্কিং ডে’ বা ‘কর্মহীন দিবস’ ঘোষণা করে বাসিন্দাদের সব ধরণের ভ্রমণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। নগরীর সড়কগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যা বাড়ানো হয় এবং ধাতব ব্যারিকেড দিয়ে বিখ্যাত রেড স্কয়ারে যাওয়ার পথ আটকে দেওয়া হয়। রাস্তায় সাঁজোয়া গাড়ি নামানো হয়। মস্কোর বিভিন্ন সরকারি ভবনের সামনেও বাড়ে নিরাপত্তা।

প্রিগোজিন দাবি করেছেন, তার যোদ্ধারা দুর্নীতিবাজ ও অযোগ্য কমান্ডার যারা ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য দায়ী তাদের ক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে ‘ন্যায়ের মিছিলে’ নেমেছে।

প্রসঙ্গত, ওয়াগনার বাহিনী ‘পুতিনের নিজস্ব সেনা’ নামেও পরিচিত। রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতের পর থেকে কিয়েভ দখলের লড়াইয়ে ওয়াগনার গ্রুপের উপর ভরসা রেখেছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে গত কয়েক মাসে ক্রেমলিন এবং ওয়াগনার গোষ্ঠীর সমীকরণে অনেক বদল এসেছে। প্রকাশ্যে আসে ওয়াগনার বাহিনী এবং মস্কোর সামরিক নেতৃত্বের মতপার্থক্য। যুদ্ধক্ষেত্রে তার বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর জন্য বার বার রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু এবং সেনাপ্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভকে দায়ী করেছেন প্রিগোজিন। এখন আর সেই দ্বন্দ্ব, তর্ক এবং বাগকবিতণ্ডার জায়গায় সীমাবন্ধ নেই। আরও একধাপ এগিয়ে তা ‘সশস্ত্র বিদ্রোহের’ রূপ নিয়েছে। ওয়াগনার গ্রুপ একটি স্বনিয়ন্ত্রিত সামরিক বাহিনী। এই বাহিনীর বিরুদ্ধে সারা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

পশ্চিমি দুনিয়ার দাবি, রাশিয়ার বিভিন্ন গোপন কাজ উদ্ধারের দায়িত্ব দেওয়া ছিল এই বাহিনীর উপর। বার বার এ–ও দাবি করা হয়েছে, ওয়াগনার গ্রুপ পুতিনের ব্যক্তিগত বাহিনী, যারা পুতিনের নির্দেশই অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। প্রিগোজিনকেও মনে করা হতো পুতিনের ‘ঘনিষ্ঠ’ হিসাবে। মনে করা হয় ক্রেমলিনের বিশেষ বিশেষ কাজ দেখাশোনার কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। তার কেটারিংয়ের ব্যবসা আছে। সেই কারণে ‘পুতিনের রাঁধুনি’ বলেও পরিচিত প্রিগোজিন।